জেলা ও মহানগরী আমীর সম্মেলন
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
স্থান: আল-ফালাহ মিলনায়তন
তারিখ: ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবসমূহ
দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যালোচনা করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘জেলা আমীর সম্মেলন’ সর্বসম্মতিক্রমে নিম্নোক্ত প্রস্তাবসমূহ গ্রহণ করছে-

১। অবিলম্বে গণভোটের রায় পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন
‘হ্যাঁ’ ভোটে বিজয়ী ‘গণভোট’ একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের মৌলিক রূপরেখা। কিন্তু গণভোটের রায় বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় জনগণের মধ্যে হতাশা ও সরকারের প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে, যা রাষ্ট্রের জন্য অশুভ সংকেত।

এ প্রেক্ষিতে ‘জেলা আমীর সম্মেলন’ জোরালোভাবে প্রস্তাব করছে যে,

ক) অবিলম্বে একটি সুস্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে, যাতে প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি জনগণের কাছে দৃশ্যমান হয়।
খ) জুলাই সনদের প্রতিটি ধারা বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীন ও কার্যকর মনিটরিং এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো পর্যায়ে শিথিলতা বা গাফিলতি না থাকে।
গ) সকল রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে জাতীয় ঐকমত্য বজায় রেখে তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।

২। জ্বালানি সংকট নিরসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ
বর্তমান জ্বালানি সংকট দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, শিল্প খাতের উৎপাদন, কৃষি কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি, গ্যাস সংকট এবং জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করেছে এবং উৎপাদনশীল খাতকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সম্মেলন প্রস্তাব করছে যে,

ক) জ্বালানি খাতে বিদ্যমান দুর্নীতি, অনিয়ম ও অদক্ষতা চিহ্নিত করে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
খ) আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করে দেশীয় গ্যাস, কয়লা ও নবায়নযোগ্য শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
গ) স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলা করা যায়।
ঘ) বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং অপচয় ও চুরি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
ঙ) জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতার জন্য দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
চ) জ্বালানি সমস্যার কারণে কৃষকেরা মারাত্মকভাবে সার সংকটে নিপতিত হয়েছেন। এ সংকট কাটিয়ে উঠতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।


৩। রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাঠামোতে দলীয়করণ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহে দলীয়করণ, পক্ষপাতিত্ব ও প্রভাব বিস্তার সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নষ্ট হচ্ছে এবং জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

এ প্রেক্ষিতে সম্মেলন প্রস্তাব করছে যে,
ক) প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে।
খ) সকল নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততাকে মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
গ) একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক ‘পাবলিক সার্ভিস কমিশন’ এর মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে।

৪। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের জীবনযাত্রার মান রক্ষা করতে হবে
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বাজার সিন্ডিকেট, মজুদদারি ও তদারকির দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।

এ অবস্থায় সম্মেলন প্রস্তাব করছে যে,
ক) বাজার সিন্ডিকেট, কারসাজি ও মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
খ) নিয়মিত বাজার মনিটরিং, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত তদারকি জোরদার করতে হবে।
গ) ভর্তুকি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও টার্গেটেড সহায়তার মাধ্যমে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে কার্যকর সহায়তা প্রদান করতে হবে।
ঘ) কৃষক ও উৎপাদকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
ঙ) হামের ভয়াবহ আক্রমণে জনস্বাস্থ্য আজ মারাত্মকভাবে হুমকির সম্মুখীন। এ থেকে উত্তররণের জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

৫। চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাস নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন
দেশব্যাপী চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিস্তার জননিরাপত্তা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হবে।

এ প্রেক্ষিতে সম্মেলন প্রস্তাব করছে যে,
ক) অপরাধীদের দলীয় পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
খ) আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে তাদের পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
গ) বিচার ব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ, দ্রুত, কার্যকর ও সময়োপযোগী করে অপরাধ দমনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ঘ) জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা জোরদার করতে হবে।
ঙ) সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকদের অন্যায়ভাবে হত্যা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

৬। জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উন্মুক্ত করে দেয়া
চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থাণের প্রেক্ষাপট, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের চরিত্র উন্মোচন এবং জাতির আত্মত্যাগের ইতিহাসকে তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে অতি দ্রুত জুলাই স্মৃতি জাদুঘর জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। এজন্য যা করতে হবে-
ক) জুলাই জাদুঘরে প্রবেশমূল্য না নেয়া
খ) স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্যাম্পেইন করা
গ) জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে গবেষণার জন্য দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা

৭। স্থানীয় সরকার নির্বাচন
রাষ্ট্রের সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচনের বিকল্প নেই। এজন্য-
ক) স্থানীয় পর্যায়ের সকল স্তরে দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে।
খ) সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সরকার দলীয় নেতাদের অপসারণ করতে হবে।

৮। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা
দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা আনতে সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে। আর্থিক খাত ভেঙে পড়লে রাষ্ট্র তার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না, জনগণ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজন্য যা করতে হবে-
ক) ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে দলীয়করণ করা যাবে না।
খ) ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অর্থ লোপাটকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
গ) দখলবাজি বন্ধ করতে হবে।
ঘ) গ্রাহকদের আমানত রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা সরকারকে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
ঙ) দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

৯। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও মুসলিম বিশ্বের করণীয়
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয় মুসলিম বিশ্বকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। নিরীহ মানুষের প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আন্তর্জাতিক বিবেককে নাড়া দিচ্ছে এবং বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ প্রেক্ষিতে সম্মেলন মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যে,
ক) মুসলিম দেশসমূহ পারস্পরিক বিভেদ ও দ্বন্দ্ব পরিহার করে কার্যকর ঐক্য ও সহযোগিতা গড়ে তুলবে।
খ) সংঘাত নিরসনে সক্রিয়, দায়িত্বশীল ও ফলপ্রসূ কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ সুগম করতে হবে।
গ) ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিতভাবে জোরদার করতে হবে।
ঘ) আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, উপরোক্ত প্রস্তাবসমূহ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষ, নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সচেতন নাগরিকদের প্রতি আমরা এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে সম্মিলিত ও আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।


ধন্যবাদান্তে-

এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের
সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং
কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।